প্রতিষ্ঠানের ইতিহাস

রুপপুর উচ্চ বিদ্যালয়ের ইতিহাস সংখিপ্ত করার কোন সুযোগ নেই। তাহলে অনেক কিছু বাদ পরে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়ে যাবে। বিদ্যালয়টি ১৯৩৩ সালে রুপপুর ফ্রি প্রাইমারি স্কুল ২ নামে যাত্র শুরু করে। কিন্তু অবাক করার বিষয় এই নামটি জনগনের মধ্যে পরিচিত ছিলো না। সর্বসাধারনের মুখে মুখে “তারাপদ স্কুল” নামে ব্যপক পরিচিতি পায়। এখনও মানুষ এই স্কুলটিকে তারাপদ স্কুল বলে ডাকে। কিন্তু কেন? কে এই তারাপদ বাবু?

১৯০১ সালের দিকে রুপপুর গ্রামে এই কীর্তিমান মানুষটি জন্মগ্রহন করেন। পেশায় তিনি ছিলেন বাংলদেশ রেলওয়ের একজন কর্মচারী (তথ্যঃ হাবাতুল্লা বিশ্বাস) । কিন্তু শিক্ষতা করা এবং অন্যদের বাড়ি থেকে ডেকে এনে পড়ানো ছিলো অন্যতম ব্রত। ফলে তিনি নিজ জমির উপর সর্বপ্রথম এক খানা টিনের ঘর তুলে বিদ্যালয়ের কার্যক্রম শুরু করেন । সঙ্গে ছিলেন তার ছোট ভাই তারকানাথ কুন্ডু, নারায়ন চক্রবতীর্, মফিজ মন্ডল, তদীয় পুত্র আব্দুল হামিদ মন্ডল প্রমুখ। ঐ সময় রুপপুর গ্রামের আরো দুইটি স্কুলের তথ্য পাওয়া যায় যেমন ভাগীতলা স্কুল ও মফিজ মন্ডল কতৃক প্রতিষ্ঠিত একটি স্কুল যা বর্তমানে ২১ নং রকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পশ্চিম পাশে রুপপুর পারমানবিক প্রকল্পের অধিগ্রহনকৃত মাঠের মধ্যে অবস্থিত ছিলো। শ্রী তারাপদ কুন্ডু যখন নিজ জমিতে স্কুল তৈরির কর্মকান্ড শুরু করেন তখন মফিজ উদ্দিন মন্ডল নিজের স্কুলটি বন্ধ করে দেন এবং ঘরটি তারাপদ বাবুর জমিতে এনে তারাপদ বাবুর সাথে শিক্ষতা শুরু করেন । ভাগীতলা স্কুলটি ছিলো বর্তমান বিবিসি বাজারের সংলগ্ন পশ্চিম পাশে। কালক্রমে সে স্কুলটি বন্ধ হয়ে যায় (তথ্য সূত্রঃ জনাব আবুল হোসেন মন্ডল, ডি আর এম, পাকশী)। ১৯৩৩ সালে থেকে বিদ্যালয়টি প্রাইমারী ফাইনাল পরীক্ষায় শিক্ষার্থীরা আংশগ্রহন শুরু করে। তখন পরীক্ষা দিতে হতো পাবনা থেকে যা জানা যায় জনাব নূরুল হকের সনদপত্র থেকে (বেঙ্গল ফর্ম নং ১৩৪৯ )। ১৯৩৩ সাল থেকে ১৯৫২ সাল পর্যন্ত এই স্কুলে প্রাথমিক পরীক্ষায় বৃত্তি পেয়েছে মোট ৪৪ জন ছাত্র, তার মধ্যে প্রথম গ্রেডে ১৬ জন এবং ২য় গ্রেডে ২৮ ছাত্র । পাবনা জেলার মধ্যে ১টি ঐতিহ্যবাহী শিক্ষা প্রতিষ্ঠানব হিসাবে তারাপদ স্কুল বিশেষ জায়গা করে নেয় (তথ্য সূত্রঃ বিদ্যালয়ের সংরক্ষিত রেজাল্ট বুক )। ১৯৪৭ সালে দেশ বিভাগের সময় শ্রী যুক্ত তারাপদ বাবু সপরিবারে চরজাজিরা, শান্তিনগর, নদীয়া, পশ্চিম বঙ্গে চলে যান। তিনি সেখানে গিয়েও শিক্ষাগন শুরু করেন । ১৬/০৬/১৯৭৫ সালে তার লেখা এটা চিঠিতে জানা যায় “স্কুলের জমির পরিমান ২০ ইঞ্চি মাপের ১ বিঘা জমি ছিলো এবং উহা স্কুল বোর্ডকে রেজিস্ট্রারি করিয়ে দেওয়া হইয়াছিলো”। ঐ চিঠির অন্য অংশে তিনি আরো উল্লেখ করেন “আশা করি আপনারা জমির গোলমালটা মিটাইয়া ফেলিয়া আমাকে জানালে নিশ্চিন্ত হইব। আমি ঐ স্কুলটির জন্য যথাসাধ্য চেষ্টা করিয়া ২০ বৎসরে গড়ে ২০টা ছাত্রকে বৃত্তিলাভ করাইয়া আশিয়াছিলাম । আমি ১৯৪৭ সালে দেশ বিভাগের ফলে চলে আসি। ১৯৪৬ সালেও ৬টি ছাত্রকে উচ্চ প্রাথমিক বৃত্তি লাভ করাইয়া আসিয়া ছিলাম। আমার দর্ভাগ্য আমি আর ঐ স্কুলটির বো করিতে পারি নাই ঐ বিদ্যালয়টির যাহাতে কোন ক্ষতি না হয় তাহার দিকে লক্ষ রাখিলে খুব আনন্দিত হইবো । ভগবানের নিকট প্রথনা করি যেন ঐ স্কুলটির দিন দিনই উন্নতি হয় এখানে লক্ষনিয় তিন স্কুলটির দাতা ছিলেন এবং নিজ নামে স্কুলটি প্রতিষ্ঠা করে নি । জমি এক বিঘা স্কুল বোর্ডকে রেজিস্ট্রি করে দেন। তৎকালিন সময়ে স্কুলটি রুপপুর ফ্রি প্রাইমারী স্কুল ২ নামে District Inspector of school, Pabna তে অধিভুক্ত হয়। কিন্তু তাহার বিশাল ব্যক্তিত্ব ও একজন প্রতিভাবান শিক্ষক যিনি ছিলেন শিক্ষক কুলের মহান গুরু ও আত্নত্যাগী, নিঃস্বার্থ কীর্তিমান পুরুষ ফলে সরকার দপতরের স্কুলটি যে নামই থাক না কেন প্রায় শত বৎসর পরেও জনগন এখনও স্কুলটিকে “তারাপদ স্কুল” বলেই ডাকে ।

তাঁর চিঠিতে জানা যায়, ডক্টর আবুল কাশেমের পিতা জনাব মহিউদ্দিন সাহেব ও ডাঃ মোশারফ হোসেন সাহেব (মুসা ডাক্টার) ছিলেন তাহার ঘনিষ্ঠ বন্ধু। বিদ্যালয়ের ১ম ছাত্র হিসাবে যার নাম পাওয়া যায় তিনি হলেন মরহুম আব্দুল বারী সরদার যিনি আব্দুল ঠিকাদার নামে ব্যাপক পরিচিত ছিলেন। (সূত্র ঃ জনাব আব্দুল হোসেন মন্ডল)। বিদ্যালয়টি ২য় পর্যায় শুরু হয় ১৬৫৪ সালে থেকে। স্কুলটি Inspectorate, of school, Rajshahi Range, Rajshahi এর ১২/০৩/৫৬ ইং এর স্বাক্ষরিত office order, memo no 105420(2) †Z Ruppur Boys junior Madrasah কে হিসাবে junior High school

মুঞ্প্রজুরি প্রদান করেন। তখন থেকে প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব পালন করেন জনাব মোঃ আলাউদ্দিন এবং ব্যবস্থাপনা কমিটির সেক্রেটারি ছিলেন যথাক্রমে ডাঃ মোঃ ঈমান আলী, ডাঃ মোঃ হাবিবুর রহমান (হাবু ডাঃ ) ও জনাব মোঃ আবুল হোসেন মন্ডর। (সূত্রঃ অধ্যাপক মোঃ সিদ্দুকুর রহমান, চুয়াডাঙ্গা রকারী কলেজ ও প্রাক্তন প্রধান শিক্ষক মোঃ আবুল কাশেম)। ১৯৫৪ সাল থেকে বিদ্যালয়টির জুনিয়র হাই স্কুলের কার্যক্রম শুরু হয় বলে বর্তমান রুপপুর উচ্চ বিদ্যালয় এর প্রতিষ্ঠা সন ১৯৫৪ খ্রিঃ থেকে লেখা হয়। স্বাধীনতার পর ২২/০৭/১৯৮৯ সালের মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা

বোর্ড, রাজশাহী’র বিদ্যালয় পরিদর্শক স্বাক্ষরিত পএ স্মারক নং ৪/এস/২৪৫/৮৮৬ তারিখে বিদ্যালয়টি ০১/০১/১৯৮৭ খ্রিঃ তারিখ কে নবম খেলার অনুমতি পায় এবং তখন থেকে রুপপুর উচ্চ বিদ্যালয়ের যাত্র শুরু হয় অর্থাৎ ১৯৫৪ সাল থেকে ৩১/১২/১৯৮৬ সাল পর্যন্ত অষ্টম শ্রেণী চালু ছিলো এবং ০১/০১/১৯৮৭ সাল থেকে

৩১/১২/১৯৮৬ সাল পর্যন্ত উন্নীত হয়। এক্ষেত্রে তৎকারীন প্রধান শিক্ষক জনাব মোঃ দেলোয়ার হোসেনের প্রচেষ্টা এবং সমসাময়িক সময়ে রাজশাহী শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যেন ও বিদ্যালয়ের পঞ্চাশ দশকের কৃতি ছাত্র ডাঃ আবুল কাশেমের সহযোগীতা অবিস্বরনীয়। ইতোমধ্যে ১৯৭১ সালে বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর জাতির জনক বঙ্গবন্ধু মেখ মুজিবর রহমানের দেশের প্রথমিক বিদ্যালয় গুলিকে সরকারী করণের ফলে বর্তমান ২১ নং রুপপুর প্রথমিক বিদ্যালয় শ্রী তারা পদ বাবু কতৃর্ক প্রদত্ত ১বিঘা জমি যা রুপপুর ফ্রি প্রইমারী স্কুল নং ২ এর জন্য রেজিস্টি করে দিয়েছিলেন সেই জমির মালিকানা পেয়ে যায় ফলে হাই স্কুলের কোন জমি সেখানে থাকে না, কিন্তু শিক্ষা বোর্ডের নিয়ম অনুযায়ি হাইস্কুলের জমি থাকা অন্যতম শর্ত। জমি না থাকায় বিদ্যালয়টি দশম শ্রেণী পর্যন্ত চালানো অসম্ভব হয়ে পেও এমনটি হাই স্কুলটি অস্তত্বি সংকটে পড়ে। ইতোমধ্যে প্রাইমারী ও হাইস্কুল দুইজন প্রধান শিক্ষক দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হতে থাকে।যে বিষয়টি তারাপদ বাবু চান নি। ২৫/০৫/১৯৮১ সালে তারাপদ বাবু শ্রী শুনীল কুন্ডুকে যে চিঠি লিখেন তাতে উল্লেখ করেন “শুনেছি উহা এখন হাই স্কুল হয়ে গেছে । সাহাপুরের মফিজ মন্ডর ও তার ছেলে আব্দুল হামিদ সেই সময় ঐ স্কুলে কাজ করতেন”। স্পষ্টতঃ বোঝা যায় তারাপদ বাবু কখনও ভাবেননি প্রাইমারী ও হাই স্কুল পৃথক হয়ে যাবে।

১৯৯০ সালে ডঃ আবুল কাশেম সাহেবের সুপারিশে তৎকালীন জেলা প্রশাসক, পাবনা নতুন রুপপুরে ফুটবল মাঠে ১.৫ একর জমি হাই স্কুলের নামে বরাদ্ধ দেন এবং ১৯৯৬ সালে বিদ্যালয়টি নতুন রুপপুরে স্থানানÍর হয়। (সূএঃ মোঃ দেলোয়ার হোসেন,প্রাক্তন প্রধান শিক্ষক)। জমি সংক্রান্ত সমস্যা তখনও প্রকট ছিল। কারণ নতুন রুপপুর পূর্নবাসন এলাকায় সমস্ত জমির মতই বিদ্যালয়ের জমি খাস খতিয়ান ভ’ক্ত ছিল। ফলে জমির মালিকানা তখনও স্কুলের ছিলনা বললেই চলে। পরবর্তীতে বাংলাদেশ সরকারের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা “রুপপরু পারমানবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র” বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত গ্রহন করেন ও নতুন রুপপুর পূর্নবাসন এলাকায় অধীবাসীদের জমি হস্তান্তরের নির্দেশ দেন। তারই পরিপেক্ষিতে বিদ্যালয়ের নামীয় ১.৫০ একর জমি বিদ্যালয়ের বর্তমান সভাপতি জনাব মোঃ হাবিবুললা ইসলাম, রুপপুর পারমানবিক প্রকল্পের প্রশাসনিক কর্মকর্তা জনাব কে এম রুহুল কুদ্দুস, জনাব জাকিউল ইসলাম (তপন সরদার), ইউ পি চেয়ারম্যান,পাকশী প্রমুখের প্রচেষ্টায় তৎকালীন উপজেলা নিবার্হী অফিসার শ্রাবসÍী রায় বিদ্যালয়ের জমির পরিমান ১.৫০ একর থেকে বৃদ্ধি করেও ১.৬০ একর প্রদানের জন্য সংশ্লিষ্ট মন্ত্রনালয়কে সুপারিশ করেন। ফলে ৩০/১০/২০১৩ খ্রিঃ তারিখে মোঃ আনিছুর রহমান, প্রশাসনিক কর্মকর্তা বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশন, আগারগাঁও, শেেও বাংলা নগর ঢাকাÑ১২০৭,ঈশ্বরদী সাব রেজিস্টি অফিসে মন্ত্রনালয়ের পক্ষে বিক্রয় কবলা কেও দেন। দলিল নংÑ৫১৯৮/১৩, জমির পরিমান ১.৬০ একর। জমি হস্তান্তরের চূড়ান্ত পর্যায়ে জনাব মোঃ হাবিবুল ইসলাম ও কে এম রুহুল কুদ্দুস সাহেবের ভূমিকা ছিল অনন্য। আমি পূর্বেই বলেছি, বিদ্যালয়ের ইতিহাস সংক্ষিপ্ত করার সুযোগ নেই। ঘাত প্রতিঘাতে বিভিন্ন সমস্যা মোকাবেলা করে বিদ্যালয়টির এখন স্তাবর সম্পত্তির সমস্যা যেমন নেই তেমনি অবকাঠামোগত অসুবিধঅও নেই এবং নতুন রুপপুর বাসির আন্তরিকতার আভাব নেই। বর্তমান ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি জনাব মোঃ হাবিবুল ইসলাম, বীর মুক্তিযোদ্ধা, সাবেক ইউপি চ্যেয়ারম্যান ও অনান্য সদস্যবৃন্দ এবং রুপপুরের সচেতন জনগোষ্ঠি ও শিক্ষক মন্ডরীর পরিশ্রমে একটি মান সম্মত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পরিনত হতে যাচ্ছে। আমি আশা করি, বিদ্যালয়টি অচিরেই কাঙ্খিত লক্ষে পৌছাবে এবং স্মরনীয় ব্যক্তিত্ব শ্রী তারাপদ বাবুর রেখে যাওয়া স্মৃতিকে আরও উজ্জল করবে। ইতিহাস লেখার ক্ষেত্রে তথ্য সরবরাহ করে যারা আমাকে সাহায্য করেছেন তাদের প্রতি রইল অকৃত্রিম কৃতজ্ঞতা।